বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে করণীয়

প্রকাশের সময়কাল ৩০ এপ্রিল, ২০১৮ , নিউজ লিখেছেন - T.i Riaz

বৈশ্বিক উষ্ণতা বজ্রপাতের কম্পাঙ্ক লক্ষণযোগ্য হারে বৃদ্ধি করছে। আমাদের দেশেও এ মৌসুমে বজ্রপাতের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিবছরই বজ্রপাতে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে করণীয় দিকগুলো আলোচনা করা হলো-

বজ্রপাতের আগ মুহূর্তের লক্ষণ

বজ্রপাত হওয়ার আগ মুহূর্তে কয়েকটি লক্ষণে কোথায় তা পড়বে তা বোঝা যেতে পারে। যেমন বিদ্যুতের প্রভাবে আপনার চুল খাড়া হয়ে যাবে, ত্বক শিরশির করবে বা বিদ্যুৎ অনুভূত হবে। এ সময় আশপাশের ধাতব পদার্থ কাঁপতে পারে। অনেকেই এ পরিস্থিতিতে ‘ক্রি ক্রি’শব্দ পাওয়ার কথা জানান। আপনি যদি এমন পরিস্থিতি অনুভব করতে পারেন তাহলে বজ্রপাত হবে এমন প্রস্তুতি নিন।

খোলা বা উঁচু স্থান থেকে দূরে থাকা

ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নেয়াই সুরক্ষার কাজ হবে।

উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুৎ লাইন থেকে দূরে থাকা

কোথাও বজ্রপাত হলে উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই এসব স্থানে আশ্রয় নেয়া যাবে না। যেমন- খোলা স্থানে বিচ্ছিন্ন একটি যাত্রী ছাউনি, তালগাছ বা বড় গাছ ইত্যাদি।

জানালা থেকে দূরে থাকা

বজ্রপাতের সময় ঘরের জানালার কাছাকাছি থাকা যাবে না। জানালা বন্ধ রেখে ঘরের ভেতর থাকতে হবে।

ধাতব বস্তু স্পর্শ না করা

বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা যাবে না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করা যাবে না।

বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের ব্যবহার থেকে বিরত থাকা

বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরা যাবে না। বজ্রপাতের আভাষ পেলে প্লাগ খুলে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখতে হবে।

গাড়ির ভেতর থাকলে

বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে থাকলে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেয়া যে পারে। গাড়ির ভেতরের ধাতব বস্তু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

গগণচুম্বী স্থান থেকে নিজেকে সরাতে হবে

এমন কোনো স্থানে যাওয়া যাবে না। যে স্থানে নিজেই ভৌগলিক সীমার সবকিছুর উপরে। মানে আপনিই সবচেয়ে উঁচু।

এ সময় ধানক্ষেত বা বড় মাঠে থাকলে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে যেতে হবে। বাড়ির ছাদ কিংবা উঁচু কোনো স্থানে থাকলে দ্রুত সেখান থেকে নেমে যেতে হবে।

পানি থেকে দূরে থাকা

বজ্রপাতের সময় নদী, জলাশয় বা জলাবদ্ধ স্থান থেকে সরে যেতে হবে। পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

পরস্পর দূরে থাকতে হবে

বজ্রপাতে সময় কয়েকজন জড়ো হওয়া অবস্থায় থাকা যাবে না। ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে সরে যেতে হবে। কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যাওয়া যেতে পারে।

নিচু হয়ে বসা

যদি বজ্রপাত হওয়ার উপক্রম হয় তাহলে কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে চোখ বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এ সময় মাটিয়ে শুয়ে পড়া যাবে না। মাটিতে শুয়ে পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

রবারের বুট পরিধান

বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। এ সময় বিদ্যুৎ অপরিবাহী রাবারের জুতা সবচেয়ে নিরাপদ।

বাড়ি সুরক্ষিত করতে হবে

বজ্রপাত থেকে বাড়িকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য আর্থিং সংযুক্ত রড বাড়িতে স্থাপন করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নিতে হবে। ভুলভাবে স্থাপিত রড বজ্রপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

বজ্রপাতে আহত হলে

বজ্রপাতে আহত কাউকে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতোই চিকিৎসা করতে হবে। দ্রুত চিকিৎসককে ডাকতে হবে। হাসপাতালে নিতে হবে। একই সঙ্গে আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তবে এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ জরুরি। যা সহজেই জেনে নেয়া যেতে পারে।
 

বজ্রপাত থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার কিছু টিপস ।

ঝড়ের কবল থেকে বাঁচার সহজ কোন উপায় না থাকলেও কয়েকটি কৌশল প্রয়োগ করে বজ্রপাত থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যায়। বজ্রপাত চলাকালে খোলা মাঠে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ মাটির দিকে নেমে আসার সময় তাকে মাধ্যম বানায়। তাই বজ্রপাত চলাকালে কতিপয় সাবধানতা অবলম্বন করুন।

১. উঁচু জায়গায় বা খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।

২. খোলা জায়গায় থাকলে ছাতা ব্যবহার করবেন না।

৩. গাছের নীচে আশ্রয় নিবেন না।

৪. বাইরে হাটার সময় বজ্রপাত দেখা দিলে দ্রুত মাটিতে বসে পড়ুন

৫. বাড়িতে আশ্রয় নিন। তবে ঘরের বাইরে উঁচু এন্টেনা থাকলে তা টিভি থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মাটির সংস্পর্শে রাখতে হবে। এছাড়া খোলা মাঠে আশেপাশে উঁচু বৃক্ষবিহীন এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করলে সেটিও বজ্রপাতে আক্রান্ত হতে পারে। ভবনের উপরে একটি খুঁটির সাথে লোহার তার স্থাপন করে তা মাটির সাথে সংযুক্ত করে দিলে উঁচু ভবনও বজ্রপাত থেকে রক্ষা পায়। এ পদ্ধতিতে টিভিও চালু রাখা যায়।

৬. আপনার বাসার বিদ্যুৎ নিরোধক যন্ত্রের (Lightning protector ) কার্যকারিতা যাঁচাই করুন (যদি থাকে)। পূর্ব প্রস্তুতি নিন এবং নিরাপদ থাকুন।

৭. বাসা থেকে বের হবার পূর্বে কম্পিউটার, টিভি ও অন্যান্য বিদ্যুৎ চালিত যন্ত্রপাতির, সম্ভব হলে, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন।

৮. পরিবারের সকলের মধ্যে বজ্রপাতের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা জাগ্রত করুন এবং বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক ও যোগাযোগ তার সমূহ ( টিভির এন্টেনা, ডিসের এ্যান্টেনা, টেলিফোনের তার ইত্যাদি ) বিচ্ছিন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৯. বিদ্যুৎ চমকানোর কারনে ভোল্টেজ প্রচন্ড ভাবে উঠা-নামা করে। এ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষার জন্য বাসার টেলিফোন সেট, কর্ডলেস ফোন, টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম, ইন্টারনেট লাইন ইত্যাদির সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখুন।

১০. সম্ভব হলে মেইন পাওয়ার সুইচ বন্ধ করুন। কারণ প্রচন্ড বজ্রপাতে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

১১. কার বা জীপে আরোহনরত থাকলে গাড়ীর দরজা ও জানালা বন্ধ রাখুন। এটি সরাসরি বিদ্যুৎ স্পৃষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা কমাবে এবং তীব্র শব্দের সরাসরি আঘাত হতে আপনাকে রক্ষা করবে।

১২. মোটরসাইকেল, সাইকেল চালকরা বাইক/সাইকেল থেকে নেমে পড়ুন এবং নিরাপদ আশ্রয় খুঁজুন।

১৩. বড় গাছের নিচে কখনও অবস্হান করবেন না কারণ গাছ বিদ্যুৎ সুপরিবাহী ও বিদ্যুৎ আকর্র্ষী।

১৪. ঝড়ের সময় গ্যাসোলিন জাতীয় দাহ্য পদার্থ ব্যবহার পরিহার করুন।

১৫. শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নবান হোন। কারণ বজ্রপাতের বিকট শব্দে তারা ভীত হতে পারে। বজ্রমেঘ দেখা মাত্র শিশুদের খেলার মাঠ থেকে ডেকে নিন।

১৬. ঘরের সব দরজা জানালা বিশেষ করে কাঁচের জানালা বন্ধ রাখুন এবং লোহার রড, গ্রীল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।

১৭. বিদ্যুৎ চমকানোর সময় স্টীলের হাতলের পরিবর্তে কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা বেশী নিরাপদ।

১৮. বজ্রমেঘ দেখে, চিনতে শিখুন। নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহন করুন। নিজের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করুন।

১৯. পুকুর, খাল, নদী বা এ জাতীয় জলাশয়ে অবস্হান করবেন না। কারন এসব জলাশয়ে বজ্রপাত হলে পুরো জলাশয়টি উচ্চ ভোল্টেজ এ পরিনত হবে। আপনি যদি উম্মুক্ত স্হানে নৌকায় অবস্হান করেন তবে যত দ্রুত সম্ভব ভূমিতে নামার চেষ্টা করুন।

২০. তীব্র বজ্রপাতের সময় কেউ ঘরের বাহিরে যাবেন না। আপনি যদি খোলা জায়গায় থাকেন তাহলে তবে দ্রুত নিকটতম যেকোন ঘরে ঢুকে পড়ুন। একান্তই সুযোগ না থাকলে বুকে হাত রেখে মাথা নিচু করে মাটিতে বসে পড়ুন। ( সিরিয়াস )

২১. বজ্রপাতের সময় জনবহুল এলাকা পরিহার করুন কারন আপনার সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তি বিদ্যুৎ স্পৃষ্ঠ হলে তার দ্বারা আপনিও বিদ্যুৎ স্পৃষ্ঠ হতে পারেন।

২২. যখন কোন ঘর বা আশ্রয় না থাকলে আপনার গোড়ালি বা পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির উপরে ভর করে দু’হাঁটুর মধ্যে মাথা রেখে মাটিতে বসে থাকতে হবে।

২৩. শুষ্ক কোন গর্ত বা খাদ থাকলে তার মধ্যে ঢুকে পড়তে হবে।

২৪. কখনই কোন বৈদু্যতিক খুঁটির নিচে বা বড় বৃক্ষ অথবা টেলিফোনের খাম্বার নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না।

২৫. মনে রাখতে হবে যে কোন উঁচু অবস্থানের উপরে বজ্রপাত আছড়ে পরে বেশি।

২৬. বজ্রপাতের সময়ে যে কোন ঘরের মধ্যে আশ্রয় নেয়াই সর্বশ্রেয়।

২৭. ঘরে থাকলেও শয়ন অবস্থায় না থাকাই ভাল।

২৮. ঝড় এবং মেঘের গর্জন ও বিদ্যুত চমকানোর আগেই ঘরের মধ্যকার বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ রাখুন।

২৯. মোবাইল ফোন ব্যবহার মানুষের ওপর বজ্রপাতের আশঙ্কা বাড়ায়। বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক্স ব্যবহার খুবই বিপজ্জনক। একজন মানুষের সঙ্গে যখন সচল মোবাইল বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থাকে, তখন তা একটি সার্কিট হয়ে যায়। ওই সার্কিটের মধ্য দিয়ে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ প্রবাহ ভেতরে প্রবেশ করে। তাই সতর্কতা জরুরী।

৩০. আগাম আবহাওয়া বার্তা জেনে সময়মতো কাজ সম্পন্ন করে ঘরে ফেরা দরকার।
 

তথ্যসূএঃ 
দৈনিক ইত্তেফাক ও বেশতো ডট কম 

সচেতনতায়ঃ

Image result for lifecyclebd.org

#lifecyclebd 
#লাইফসাইকেবিডি 
#Donate_Blood_Protect_Lives. 
#আসুন_নিজে_সচেতন_হই 
#অন্যকে_সচেতন_করি।